আজ ২২শে আষাঢ়, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ৬ই জুলাই, ২০২০ ইং

পাকিস্তানের ‘মাদার তেরেসা’ রুথ ফাউয়ের ৯০তম জন্মদিনে গুগল ডুডল প্রকাশ করে বিশেষ সম্মান জানিয়েছে। ছবি: গুগল

পাকিস্তানের ‘মাদার তেরেসার’ জন্মদিনে গুগলের ডুডল

পাকিস্তানের ‘মাদার তেরেসা’ রুথ ফাউয়ের ৯০তম জন্মদিনে গুগল বিশেষ সম্মান জানিয়েছে। সম্মানে ডুডল প্রকাশ করেছে গুগল।

রোগীর সেবা করছেন এক নারী। পেছনে বড় একটা জানালা, দেখা যাচ্ছে আকাশে সূর্য উঠছে। এই ছবি ছিল গতকাল সোমবার গুগল ডুডলে। ক্লিক করলে দেখা যাচ্ছে, ‘পাকিস্তানের মাদার তেরেসা’ চিকিৎসক রুথ ফাউয়ের জন্মদিনে শ্রদ্ধা জানাতেই বিশেষ এ ডুডল প্রকাশ করেছে গুগল।

রুথ ফাউকে বলা হয় পাকিস্তানের ‘মাদার তেরেসা’। জন্মে ১৯২৯ সালের ৯ সেপ্টেম্বর জার্মানির লিপজিগ শহরে। পাকিস্তানে সেবার কাজে নিজেকে ব্রতী করার গল্প সবার জানা। দেশটিতে দীর্ঘদিন ধরে কুষ্ঠ রোগীদের সেবা করে ‘মাদার তেরেসা’ নামে পরিচিত হয়েছিলেন। ২০১৭ সালের ১০ আগস্ট পৃথিবী ছেড়ে চলে যান এই চিকিৎসক।

১৯৬০ সালে জার্মানি থেকে ভারতে আসছিলেন ৩১ বছরের রুথ ফাউ। ভিসাসংক্রান্ত সমস্যার কারণে পাকিস্তানের করাচিতে আটকে যান কিছুদিনের জন্য। এই আটকে যাওয়াই বদলে দেয় রুথের জীবন, সেই সঙ্গে তিনিও বদলে দেন আরও হাজারো মানুষের জীবন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিভীষিকার মধ্যে ছোটবেলা কেটেছে রুথের। মিত্রবাহিনীর বোমা হামলায় ধ্বংস হয় তাঁর শহর, তাঁর বাড়ি। যুদ্ধের শেষে পরিবারসহ চলে যেতে হয় সোভিয়েতনিয়ন্ত্রিত পূর্ব জার্মানিতে। চরম দারিদ্র্যের মধ্য দিয়ে চলে জীবন। জানা গেছে, এ জন্য রুথ ফাউয়ের সামনেই মারা গিয়েছিল ছোট ভাই। ১৯৪৮ সালে, ২১ বছর বয়সে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তিনি পালিয়ে যান পশ্চিম জার্মানিতে। এরপরই সেখানকার ইউনিভার্সিটি অব ম্যাইঞ্জে চিকিৎসক হতে শুরু করেন পড়াশোনা। চিকিৎসকের পাশাপাশি নিজেকে গড়ে তোলেন একজন সন্ন্যাসিনী হিসেবেও। যোগ দেন ক্যাথলিক খ্রিষ্টান নারীদের সংঘে। সেই সংঘই ১৯৬০ সালে তাঁকে দক্ষিণ ভারতে পাঠায় কাজের জন্য। কিন্তু তিনি আটকা পড়েন করাচিতে। করাচিতে থাকার সময়ে হঠাৎই একদিন তিনি পৌঁছে যান কুষ্ঠরোগীদের একটি কলোনিতে, তখনকার ম্যাকলয়েড রোডে। সমাজ থেকে বহিষ্কৃত মানুষগুলোকে রীতিমতো অমানবিক ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বাস করতে দেখেন তিনি। ঘরের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে ছোট নালা, সেখানে ছুটছে ইঁদুর। কখনো কখনো ইঁদুরে কামড়ে নিয়ে চলে যেত কুষ্ঠরোগীদের আঙুল, অচেতন থাকায় রোগীরা বুঝতেও পারতেন না। এসব দেখে বিচলিত হন তিনি। ঠিক করেন, এ মানুষগুলোর সেবা করবেন, সেখানেই থেকে যাবেন।

আর্তমানবতার সেবার কারণে ‘পাকিস্তানের মাদার তেরেসা’ হিসেবে বিশ্বে পরিচিত হয়েছেন রুথ ফাউ। ছবি: এএফপি

বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে রুথ ফাউ জানিয়েছিলেন, ১৯৬০ সালে দেখা কুষ্ঠরোগীদের সেই কলোনিই তাঁর জীবনের সব চেয়ে বড় সিদ্ধান্তটি নিতে সাহায্য করেছিল। এক বছরের মধ্যেই তাঁর উদ্যোগে এবং ক্যাথলিক সংঘের সহায়তায় করাচিতে প্রতিষ্ঠিত হয় কুষ্ঠ রোগীদের জন্য হাসপাতাল। পাকিস্তানের প্রথম এই কুষ্ঠ হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার পর থেকেই রোগী এবং রোগীর পরিবারকে নানা রকম সাহায্য করতে শুরু করেন তাঁরা। পাকিস্তান ছাড়িয়ে পাশের দেশ আফগানিস্তানেও খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে এ হাসপাতালের। পাকিস্তানের মতো একটি দেশে ষাটের দশকে তিনি যে খুব সহজে এসব কাজ করতে পারেননি, তা বলাই বাহুল্য। কুষ্ঠ রোগকে তখন শুধু রোগ হিসেবেই না, বরং বড় কোনো পাপের শাস্তি হিসেবে দেখা হতো তখনকার পাকিস্তান সমাজে। তাদের সাহায্য কিংবা চিকিৎসার জন্য কেউ এগিয়ে আসতেন না।

চিকিৎসক রুথ প্রথম যে কাজটি করেছেন, তা হলো ঘরে ঘরে গিয়ে মানুষের মাঝে সচেতনতা ছড়িয়ে দিয়েছেন। তাঁদের বুঝিয়েছেন। তিনি প্রতিটি রোগীর বাড়িতে গিয়ে, তাঁদের পরিবারের লোকদের সঙ্গে কথা বলে বুঝিয়েছেন, কুষ্ঠ নিরাময়যোগ্য রোগ। ঘরে বন্দী করে রাখা রোগীদের তিনি হাসপাতালে নেন। ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের সহযোগিতা পেতে শুরু করেন তিনি। রুথ ফাউয়ের অক্লান্ত পরিশ্রম এবং চেষ্টার ফলে সরকারও সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়। ১৯৭১ সালে সরকারের সহায়তায় কুষ্ঠ রোগের প্রকোপ থাকা প্রদেশগুলোতে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন কুষ্ঠ চিকিৎসা এবং নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র। বালুচিস্তান, সিন্ধু, উত্তর পাকিস্তান, পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীর, এমনকি আফগানিস্তান পর্যন্ত গিয়েছেন তিনি কুষ্ঠরোগীদের চিকিৎসা দেওয়ার জন্য। তিনি ঘরে ঘরে গিয়ে রোগীদের তাঁর হাসপাতালে নিয়ে আসতেন। চিকিৎসার পাশাপাশি খাবার, ভালো থাকার জায়গা এবং শিক্ষার ব্যবস্থাও করতেন।

১৯৭৯ সালে চিকিৎসক রুথ পাকিস্তান সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা নিযুক্ত হন। এ সময় তিনি বিশেষ পুরস্কারও পান। রুথের প্রচেষ্টায় পাকিস্তানে কুষ্ঠরোগীর সংখ্যা কমতে থাকে। সেরে যাওয়া রোগীদের সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্যও করে তোলেন তিনি। তাঁর চেষ্টার ফলস্বরূপ ১৯৯৬ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা পাকিস্তানের কুষ্ঠরোগ নিয়ন্ত্রিত অবস্থায় পৌঁছেছে বলে স্বীকৃতি দেয়। রুথের প্রচেষ্টায় পাকিস্তানে কুষ্ঠরোগ এবং এর কারণে মৃত্যুর হার একেবারেই কমতে শুরু করে। ১৯৮০ সালে পাকিস্তানে ১৯ হাজার ৩৯৮ জন কুষ্ঠরোগের জন্য চিকিৎসাধীন ছিল। ২০১৬ সালে সে সংখ্যা কমে দাঁড়ায় মাত্র ৫৩১-তে!

কুষ্ঠরোগীদের পাশাপাশি মানবতার জন্যও সারা জীবন কাজ করে গেছেন রুথ ফাউ। ২০০০ সালে বালুচিস্তানের খরা, ২০০৫ সালে কাশ্মীরের ভূমিকম্প কিংবা পাকিস্তানে ভয়াবহ বন্যায় দাঁড়িয়েছেন আক্রান্ত মানুষের পাশে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিজেও নানা অসুখে ভুগতে শুরু করেন রুথ। ২০১৭ সালের ১০ আগস্ট করাচির এক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি। তাঁকে সমাধিস্থ করা হয় করাচিতে। সারা বিশ্বের সামনে রেখে যান সেবা ও মানবতার অনন্য নিদর্শন। তাই তাঁর জন্মদিনে বিশেষ ডুডল বানিয়ে সম্মান জানাল গুগলও। এর মধ্য দিয়ে সারা পৃথিবীতে পৌঁছে গেল রুথ ফাউয়ের জীবনের কাহিনি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     এ জাতীয় আরও খবর

juboraj.com